কাউন্সেলিং কি, কীভাবে কাজ করে, কার দরকার
বাংলাদেশে কাউন্সেলিং শব্দটা নিয়ে দুটো ভুল ধারণা খুব চালু আছে। এক, কাউন্সেলিং মানে কেউ আপনাকে উপদেশ দেবে। দুই, কাউন্সেলিং শুধু পাগল হয়ে গেলে লাগে।
দুটোই ভুল।
কাউন্সেলিং আসলে কী
কাউন্সেলিং হলো একজন প্রশিক্ষিত মানুষের সাথে নির্দিষ্ট সময়ের কাঠামোবদ্ধ কথোপকথন, যার লক্ষ্য আপনাকে নিজের সমস্যা বুঝতে আর সামলাতে সাহায্য করা।
মূল কথাটা হলো, কাউন্সেলর আপনাকে বলেন না কী করতে হবে। তিনি প্রশ্ন করেন, শোনেন, আর এমন জায়গায় আলো ফেলেন যা আপনি একা দেখতে পাচ্ছিলেন না।
বন্ধুর সাথে কথা বলার সাথে পার্থক্য কী
| বন্ধু | কাউন্সেলর |
|---|---|
| আপনার পক্ষ নেয় | নিরপেক্ষ থাকেন, তাই সত্যিটা বলতে পারেন |
| নিজের অভিজ্ঞতা থেকে পরামর্শ দেয় | প্রমাণভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহার করেন |
| আপনার সম্পর্কের জালের ভেতরে | বাইরের মানুষ, বিচার করেন না |
| কথা ছড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে | পেশাগত গোপনীয়তার বাধ্যবাধকতা আছে |
| আপনার কষ্টে নিজেও ক্লান্ত হয়ে পড়ে | এটাই তাঁর প্রশিক্ষিত কাজ |
বন্ধু দরকার। কিন্তু বন্ধু কাউন্সেলরের বিকল্প নয়, আর কাউন্সেলরও বন্ধুর বিকল্প নয়।
একটা সেশনে আসলে কী হয়
প্রথম সেশন সাধারণত ৪৫ থেকে ৬০ মিনিট। যা হয়:
- শুরু। কাউন্সেলর জানিয়ে দেন গোপনীয়তার নিয়ম কী, কোন পরিস্থিতিতে তিনি চুপ থাকতে পারবেন না।
- আপনি বলেন। কী নিয়ে এসেছেন। গুছিয়ে বলার দরকার নেই। কান্না পেলে কাঁদতে পারেন, চুপ করে থাকলেও চলে।
- প্রশ্ন। কবে থেকে, কখন বাড়ে, কী করলে একটু কমে, আগে কী চেষ্টা করেছেন।
- লক্ষ্য ঠিক করা। এই কয়েকটা সেশনে ঠিক কী বদলাতে চান, সেটা স্পষ্ট করা হয়।
- ছোট একটা কাজ। অনেক সময় পরের সেশনের আগে করার মতো একটা ছোট অনুশীলন দেওয়া হয়।
কতদিন লাগে
নির্ভর করে সমস্যার ওপর। মোটামুটি ধারণা:
- নির্দিষ্ট একটা সমস্যা, যেমন পরীক্ষার ভয় বা একটা সিদ্ধান্ত নিতে না পারা: ৪ থেকে ৮ সেশন
- দুশ্চিন্তা বা হালকা থেকে মাঝারি ডিপ্রেশন: ৮ থেকে ১৬ সেশন
- পুরনো আঘাত, দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ধরন: আরও বেশি সময়
প্রথম দুই তিন সেশনে অনেকের একটু হালকা লাগে, শুধু বলতে পারার কারণেই। আসল পরিবর্তন আসে ধীরে।
কার কাউন্সেলিং দরকার
এটা শুধু "মানসিক রোগীদের" জন্য না। যাদের কাজে লাগে:
- যিনি টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে মন খারাপ, আর কারণটা ধরতে পারছেন না
- যিনি সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় থাকেন, ঘুম আসে না
- যিনি সম্পর্ক বা বিয়েতে একই ঝগড়া বারবার করছেন
- যিনি প্রিয় কাউকে হারিয়েছেন আর সামলাতে পারছেন না
- যিনি পরীক্ষা, চাকরি বা ক্যারিয়ারের চাপে ভেঙে পড়ছেন
- যিনি নিজেকে নিয়ে সারাক্ষণ নেতিবাচক ভাবেন
- যিনি বড় একটা সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়িয়ে আটকে গেছেন
যেখানে কাউন্সেলিং যথেষ্ট নয়। নিজের ক্ষতি করার চিন্তা আসছে, বাস্তবতার সাথে সংযোগ হারাচ্ছেন, বা কয়েক মাস ধরে দৈনন্দিন কাজ একেবারেই চালাতে পারছেন না, এসব ক্ষেত্রে একজন সাইকিয়াট্রিস্টের মূল্যায়ন দরকার। কাউন্সেলিং তখনও চলতে পারে, কিন্তু একা যথেষ্ট নয়।
বাংলাদেশে কাউন্সেলিংয়ের খরচ
বাজারে দাম মোটামুটি এই রকম:
- বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কাউন্সেলিং সেন্টার: শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে বা খুব কম, তবে অপেক্ষা লম্বা
- বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী প্যাকেজ: প্রায় ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকা
- সাধারণ ব্যক্তিগত সেশন: ১,৫০০ থেকে ৪,৫০০ টাকা, সেশনের দৈর্ঘ্য অনুযায়ী
- দম্পতি বা পারিবারিক সেশন: সাধারণত আরও বেশি, কারণ সময় বেশি লাগে
মনখোলায় সার্টিফাইড সাইকোলজিস্ট বা সাইকিয়াট্রিস্টের সেশন ভয়েস কলে ৫০ মিনিট ২,৫০০ টাকা, টেক্সটে ৬০ মিনিট ২,০০০ টাকা, আর ৪ সেশনের প্যাকেজ ৯,০০০ টাকা। শুধু মন খুলে বলতে চাইলে সার্টিফাইড লিসেনারের সেশন ৬০০ টাকা থেকে।
অনলাইন কাউন্সেলিং কি কাজ করে
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনলাইনের কয়েকটা সুবিধা বাস্তব:
- ঢাকার বাইরে থাকলেও ভালো পেশাদারের কাছে পৌঁছানো যায়
- চেম্বারে ঢোকার সময় পরিচিত কারো চোখে পড়ার ভয় থাকে না
- যাতায়াতের সময় আর খরচ বাঁচে
- ছদ্মনামে নেওয়া যায়
সীমাবদ্ধতাও আছে। জরুরি অবস্থা, তীব্র ঝুঁকি, বা ওষুধের প্রয়োজন থাকলে সরাসরি দেখা করাই ভালো। ইন্টারনেট খারাপ হলে সেশনের মান পড়ে যায়।
ভালো কাউন্সেলর চেনার উপায়
- ডিগ্রি আর অভিজ্ঞতা জিজ্ঞেস করলে স্পষ্ট উত্তর দেন
- প্রথম সেশনেই গোপনীয়তার নিয়ম বলে দেন
- "এক সেশনেই ঠিক করে দেব" জাতীয় প্রতিশ্রুতি দেন না
- আপনাকে বিচার করেন না, দোষ দেন না
- দরকার হলে অন্য পেশাদারের কাছে পাঠাতে দ্বিধা করেন না
উল্টোটা দেখলে সরে আসুন। প্রথম কাউন্সেলরের সাথে না মিললে দ্বিতীয়জনের কাছে যাওয়াটা ব্যর্থতা নয়, স্বাভাবিক।
মন খুলে বলার জায়গা খুঁজছেন?
মনখোলায় সার্টিফাইড লিসেনার বা সার্টিফাইড সাইকোলজিস্টের সাথে সম্পূর্ণ প্রাইভেট অনলাইন সেশন নিতে পারেন। ঘরে বসেই, নির্ধারিত সময়ে, ছদ্মনামে। ভিডিও অন করা বাধ্যতামূলক নয়।