সাইকোলজিস্ট আর সাইকিয়াট্রিস্টের পার্থক্য কী, কার কাছে যাবেন
মানসিক সমস্যা নিয়ে সাহায্য নিতে গেলে প্রথম যে প্রশ্নটা আটকে দেয়, সেটা হলো কার কাছে যাব। সাইকোলজিস্ট, না সাইকিয়াট্রিস্ট, না কাউন্সেলর। নামগুলো কাছাকাছি শোনায়, কিন্তু কাজ আলাদা।
ভুল জায়গায় গেলে সময় নষ্ট হয়, টাকা নষ্ট হয়, আর অনেকে দ্বিতীয়বার আর চেষ্টাই করেন না। তাই পার্থক্যটা পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার।
এক লাইনে পার্থক্য
সাইকিয়াট্রিস্ট একজন ডাক্তার। তিনি MBBS করেছেন, তারপর মানসিক রোগে বিশেষায়িত ডিগ্রি নিয়েছেন। তিনি রোগ নির্ণয় করতে পারেন এবং ওষুধ লিখতে পারেন।
সাইকোলজিস্ট ডাক্তার নন। তিনি মনোবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন, সাধারণত ক্লিনিক্যাল বা কাউন্সেলিং সাইকোলজিতে। তিনি কথা বলার মাধ্যমে চিকিৎসা করেন, অর্থাৎ সাইকোথেরাপি বা টক থেরাপি। তিনি ওষুধ লিখতে পারেন না।
পাশাপাশি তুলনা
| সাইকিয়াট্রিস্ট | সাইকোলজিস্ট | |
|---|---|---|
| পড়াশোনা | MBBS, তারপর মানসিক রোগে বিশেষায়িত ডিগ্রি (যেমন MD in Psychiatry, MCPS, FCPS) | মনোবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, সাধারণত MS in Clinical Psychology বা Counselling Psychology |
| ওষুধ লিখতে পারেন? | হ্যাঁ | না |
| মূল কাজ | রোগ নির্ণয়, ওষুধ, জৈবিক চিকিৎসা | থেরাপি, আচরণ ও চিন্তার ধরন পরিবর্তনে সাহায্য, মানসিক অবস্থার মূল্যায়ন |
| সেশনের দৈর্ঘ্য | সাধারণত ছোট, ১০ থেকে ২০ মিনিট, ফলোআপে আরও কম | সাধারণত ৪৫ থেকে ৬০ মিনিট |
| কতবার যেতে হয় | ওষুধ ঠিক না হওয়া পর্যন্ত ঘন ঘন, পরে মাসে একবার | সাধারণত সাপ্তাহিক বা পাক্ষিক, কয়েক মাস ধরে |
| নিয়ন্ত্রক সংস্থা | বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC) | বাংলাদেশ ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি সোসাইটি, বাংলাদেশ সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (BPA) |
তাহলে কাউন্সেলর কে?
কাউন্সেলর শব্দটা বাংলাদেশে ঢিলেঢালাভাবে ব্যবহার হয়। কেউ কেউ কাউন্সেলিং সাইকোলজিতে স্নাতকোত্তর করা, কেউ আবার সংক্ষিপ্ত কোর্স করা।
এটা একটা সমস্যা। তাই কাউন্সেলরের কাছে যাওয়ার আগে সরাসরি জিজ্ঞেস করুন, তিনি কোথা থেকে কী ডিগ্রি নিয়েছেন, কত বছর কাজ করছেন, আর কোনো পেশাদার সংগঠনের সদস্য কিনা। ভালো কাউন্সেলর এই প্রশ্নে বিরক্ত হবেন না।
আপনার সমস্যায় কার কাছে যাবেন
সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যান, যদি
- ঘুম টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে ভেঙে গেছে, বা একেবারেই হচ্ছে না
- খাওয়া বা ওজনে বড় পরিবর্তন এসেছে
- এমন কিছু শুনছেন বা দেখছেন যা অন্যরা পাচ্ছে না
- নিজের ক্ষতি করার বা আত্মহত্যার চিন্তা আসছে
- মেজাজ চরম ওঠানামা করছে, কখনো অস্বাভাবিক উত্তেজিত কখনো একেবারে নিস্তেজ
- দৈনন্দিন কাজ, চাকরি বা পড়াশোনা কয়েক মাস ধরে চালাতে পারছেন না
- আগে কেউ ওষুধ দিয়েছিলেন এবং সেটা পর্যালোচনা করা দরকার
সাইকোলজিস্টের কাছে যান, যদি
- দুশ্চিন্তা, ভয় বা প্যানিক বারবার ফিরে আসছে
- সম্পর্ক, বিয়ে বা পরিবারের সমস্যায় আটকে আছেন
- শোক বা বড় কোনো ক্ষতি সামলাতে পারছেন না
- পরীক্ষা, ক্যারিয়ার বা কাজের চাপে ভেঙে পড়ছেন
- পুরনো কোনো আঘাত বা নির্যাতনের স্মৃতি এখনো তাড়া করছে
- রাগ, আত্মবিশ্বাসের অভাব বা নিজেকে নিয়ে নেতিবাচক চিন্তা বদলাতে চান
অনেক ক্ষেত্রে দুজনকেই লাগে। মাঝারি থেকে তীব্র ডিপ্রেশনে সাধারণত ওষুধ আর থেরাপি একসাথে সবচেয়ে ভালো কাজ করে। এটা দুর্বলতা নয়, এটাই স্বাভাবিক চিকিৎসা পদ্ধতি। একজন সাইকিয়াট্রিস্ট ওষুধ দেখবেন, একজন সাইকোলজিস্ট চিন্তা আর আচরণ নিয়ে কাজ করবেন।
বাংলাদেশে খরচ কেমন
দাম প্রতিষ্ঠান আর অভিজ্ঞতাভেদে আলাদা। মোটামুটি একটা ধারণা:
- সরকারি হাসপাতালের মানসিক রোগ বিভাগ, যেমন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট: খরচ সবচেয়ে কম, কিন্তু ভিড় বেশি আর সময় কম পাওয়া যায়
- বেসরকারি চেম্বারে সাইকিয়াট্রিস্ট: সাধারণত হাজার টাকার ঘরে, সিনিয়র হলে আরও বেশি
- বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সাইকোলজিস্টের থেরাপি সেশন: বাজারে সাধারণত ১,৫০০ থেকে ৪,৫০০ টাকার মধ্যে, সেশনের দৈর্ঘ্য অনুযায়ী
- অনলাইন সেশন: সাধারণত কম, কারণ যাতায়াত আর চেম্বারের খরচ নেই
মনখোলায় সার্টিফাইড সাইকোলজিস্ট বা সাইকিয়াট্রিস্টের সাথে ভয়েস কলে ৫০ মিনিটের সেশন ২,৫০০ টাকা, টেক্সটে ৬০ মিনিট ২,০০০ টাকা। শুধু মন খুলে বলার জন্য সার্টিফাইড লিসেনারের সেশন ৬০০ টাকা থেকে শুরু।
প্রথম সেশনে কী হয়
অনেকে ভয় পান, ভাবেন কী বলব, কীভাবে শুরু করব। বাস্তবে প্রথম সেশনটা বেশিরভাগ সময় শোনার সেশন।
- আপনি কী নিয়ে এসেছেন, সেটা নিজের ভাষায় বলবেন। গুছিয়ে বলতে না পারলেও সমস্যা নেই।
- কবে থেকে শুরু, কখন বাড়ে, ঘুম আর খাওয়া কেমন, এসব জিজ্ঞেস করা হবে।
- আগে কোনো চিকিৎসা বা ওষুধ নিয়েছেন কিনা জানতে চাওয়া হবে।
- শেষে একটা পরিকল্পনা দেওয়া হবে, কতগুলো সেশন লাগতে পারে, কী নিয়ে কাজ হবে।
এক সেশনে সব ঠিক হয়ে যাবে, এমন প্রতিশ্রুতি কেউ দিলে সতর্ক হন।
যাওয়ার আগে যে প্রশ্নগুলো করবেন
- আপনার ডিগ্রি কী, কোথা থেকে করেছেন?
- এই ধরনের সমস্যা নিয়ে আপনি কত দিন কাজ করছেন?
- কোনো পেশাদার সংগঠনের সদস্য বা রেজিস্ট্রেশন আছে?
- আনুমানিক কতগুলো সেশন লাগতে পারে?
- আমার কথা গোপন থাকবে তো? কোন পরিস্থিতিতে থাকবে না?
সংক্ষেপে
ওষুধ লাগতে পারে মনে হলে সাইকিয়াট্রিস্ট। কথা বলে সমাধান খুঁজতে চাইলে সাইকোলজিস্ট। বুঝতে না পারলে যেকোনো একজনের কাছে যান, তিনি দরকার হলে অন্যজনের কাছে পাঠাবেন।
সবচেয়ে খারাপ সিদ্ধান্তটা হলো কারো কাছেই না যাওয়া।
মন খুলে বলার জায়গা খুঁজছেন?
মনখোলায় সার্টিফাইড লিসেনার বা সার্টিফাইড সাইকোলজিস্টের সাথে সম্পূর্ণ প্রাইভেট অনলাইন সেশন নিতে পারেন। ঘরে বসেই, নির্ধারিত সময়ে, ছদ্মনামে। ভিডিও অন করা বাধ্যতামূলক নয়।